ঝলমলে এক রোদালো সকালে দত্ত বাড়ির কর্তা কালিগতি দত্ত মাথায় জোড়হস্ত ভঙ্গিতে এক এক করে তাঁর আরাধ্য ফুটবল-দেবতা যথা শিব ভাদুড়ি,বিজয় ভাদুড়ি,গোষ্ঠ পাল প্রভৃতিদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম করতে করতে কখন যে নিজের ছবির সামনে এসে হাজির হয়েছেন টেরই পাননি; এমন সময় উল্টোদিক থেকে হঠাৎ তার গিন্নীর গলা পাওয়া গেল,
" হ্যাঁ গো তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?""কেন?"
"নিজের ছবিকে নিজে প্রণাম করছ ?"
"অ্যাঁ..ও হ্যাঁ তাই তো ! "
গিন্নীর কথায় সৎবিৎ ফেরে কর্তার; কিন্তু কিভাবে গোলমালটা ঘটল ভাববার ফুরসৎ পান না তাঁরা..."ঝনাৎ" শব্দ সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে নীচতলা থেকে। গিন্নী হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে সিঁড়ির মুখ থেকে বাড়ির ভৃত্যটিকে দেখতে পেয়ে শুধোন__
"কী হল রে?"
"এই ,ইয়ে ছোটদাদাবাবু আর আপনার ভাই ,শালাবাবু বল খেলতে খেলতে জানলার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলেছেন।"
বাড়ির কোন কিচ্ছুই আর এভাবে আস্ত থাকবে না ,এই উদ্বেগ গিন্নী প্রকাশ করায় বাড়ির কর্তা তাঁকে কাঁচ বদলে দেবেন বলে এমন ভঙ্গিতে আশ্বস্ত করেন যেন এটা ভারী স্বাভাবিক ঘটনা। এরপর আরো বার দুই তিন 'ঝনাৎ' শব্দের পুনরাবৃত্তি ও ভৃত্যের পুনরাবির্ভাব মারফৎ বড় আয়না ইত্যাদি জিনিসপত্র ভাঙ্গার খবর শুনে আর থাকতে না পেরে গৃহিনী সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে এলেন ," সমাজ গেল, দেশ গেল, সংসার গেল..." দৈবাৎ শট নেওয়া বলটি তার কপালে সপাটে এসে পড়ল...ককিয়ে উঠে একটা "উফ! আমার মাথাটাও গেল! " বলে বাক্যসম্পূরণ করলেন তিনি! পাশে দাঁড়িয়ে নিরুত্তাপ কর্তা শটটির বেজায় তারিফ করে বললেন " আমাদের মজিদ ঠিক এইরকম হেড করতো !"এরপর একেবারে হুলুস্থুল কান্ড!!
![]() |
| ধন্যি মেয়ে ছবির সেই দৃশ্য |
![]() |
| সেই শুটিং স্পট আজ (ছবি:© স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়) |
![]() |
| সত্যনারায়ণ খাঁ-র সেই বাড়ি, আজ যেমন (ছবি:© স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়) |
হ্যাঁ , কমবেশি সকলেই ঠিকই ধরেছেন ! এ ছবি দেখেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। শ্রী অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত 'ধন্যি মেয়ে ' (১৯৭১) ছবির এইসব দৃশ্য আট থেকে আশি সবার কাছে আজও সমান উপভোগ্য।
তবে হাওড়া জেলার 'জগৎবল্লভপুর'-এর পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে এই ছবির আবেদন সম্পূর্ণ ভিন্ন, এই গ্রামের প্রৌঢ় ও বৃদ্ধদের কাছে এ ছবি তৈরীর স্মৃতি যেন এই সেদিনের কথা! মাঝের ৪৬টা বছর যেন এক আশ্চর্য জাদুমন্ত্রে গায়েব হয়ে গেছে!

সত্যনারায়ণ খাঁ-র বাড়ির মূল ফটকের সামনে, মেহবুব হোসেন মল্লিক ও প্রতিবেদক
গাঁয়ের অনেকেই সে সময় সকালে প্রাতভ্রমণরত দেখেছেন মহানায়ক উত্তমকুমার-কে। ধন্যি মেয়ে ছবিতে যাঁকে দেখা গিয়েছিল সর্ব্বমঙ্গলা স্পোর্টিং ক্লাবের কর্তা কালিগতি দত্ত'র ভূমিকায়। তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়,ভাই বগলা'র ভুমিকায় পার্থ মুখোপাধ্যায়, শ্যালক ঘন্টেশ্বর রূপী তপেন চট্টোপাধ্যা্য়, এবং হবু ভ্রাতৃবধূ ওরফে 'ধন্যি মেয়ে' মনসা'র ভূমিকায় অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়ি এঁরা সবাই বেশ কয়েক মাস ধরে এ গ্রামের পথেঘাটে শুটিং করেছেন এই ছায়াছবির, ফলত এঁদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন এই গ্রামের মানুষজন।
![]() |
| সত্যনারায়ণ খাঁ-র সেই বাড়ি ,সামনে থেকে (ছবি:© স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়) |
গ্রামের বয়স্ক বাসিন্দাদের মনে এইসব শুটিং-এর স্মৃতি অমলিন । এই গ্রামে একসময় শুটিং হয়েছে আরো বহু বাংলা ছবির। বেশিরভাগ ছবিতেই নায়ক ছিলেন উত্তমকুমার ---- যেমন 'হার মানা হার' , 'ধন্যি মেয়ে' ,' আলোর ঠিকানা','সন্ন্যাসী রাজা' , 'আসাধারণ' ,'বনপলাশির পদাবলী', 'গৃহদাহ' প্রভৃতি আরো বহু ছবির। তার প্রধান কারণ হল তৎকালীন বাংলা ছায়াছবির অন্যতম প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থা ' শ্রী চন্ডীমাতা ফিল্মস্ ' এর কর্ণধার ৺শ্রী সত্যনারায়ণ খাঁ ছিলেন এই গ্রামেরই এক প্রভাবশালী ধনী ব্যবসায়ী।
৺ সত্যনারায়ণ খাঁ তাঁরই অর্থানুকুল্যে ও সহায়তায় এই গ্রামের যা কিছু প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার সূত্রপাত। এই গ্রামের স্কুল,কলেজ,হাসপাতা্,দাতব্য চিকিৎসালয় সবকিছুর নেপথ্যেই অনেকখানি ছিল এই ব্যক্তির অবদান। চিত্রতারকাদের সুবিধার্থে এ ই গ্রামে সেই যুগে দাঁড়িয়ে সমস্ত রকম আধুনিক সুযোগ সুবিধাযুক্ত একটি তিনতলা বাড়ি তিনি তৈরী করান, যা বয়সের ভারে এবং সংরক্ষণের অভাবে জীর্ণ হয়েও আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ বাড়িতে কার পায়ের ধুলো পড়েনি!! শুটিং করতে এসে একাধিকবার এ বাড়িতে রাত কাটিয়ে গেছেন পাহাড়ি সান্যাল, ছবি বিশ্বাস , উত্তমকুমার, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়,নৃপতি চট্টোপাধ্যায়,রবি ঘোষ প্রমূখ দিকপালরা। বর্তমানে এ বাড়িতে পরিবারের সদস্যা হিসাবে রয়েছেন সত্যনারায়ণ খাঁ-এর পুত্রবধূ মৃদুলা খাঁ । তাঁর থেকেই শোনা গেল যে দোতলায় উত্তমকুমারের জন্য একটি ঘর নির্দিষ্ট করা থাকত, বলা বাহুল্য তা করে রাখতেন তাঁর শ্বশুরমশাই । এ বাড়ির সিঁড়ির মুখেই শুটিং হয়েছিল লেখার গোড়ায় বর্ণিত সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের কপালে ফুটবল আছড়ে পড়ার দৃশ্যের ! বাড়ির অন্যান্য অংশেরও একাধিকবার দেখা মিলেছে ধন্যি মেয়ে ছবিতে। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি দৃশ্যের ছবি ও বাড়ির বর্তমান অবস্থায় সেই জায়গাগুলিকে মিলিয়ে দেখলে মনে হয় এই তো শুটিং সেরে গেছে ইউনিট, বাড়ি রয়ে গেছে যে কে সেই
![]() |
| সেই মাঠ, এখন যেমন (ছবি:© স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়) |
![]() |
| সিনেমায় সেই মাঠ |
বাড়ির অদূরেই রয়েছে সেই মাঠ; যেটিকে ছবিতে দেখা গিয়েছিল 'হাড়ভাঙা' গ্রামের ফুটবল মাঠ হিসেবে। যেখানে মাইক হাতে ধারাবিবরণী শোনাচ্ছিলেন 'ন্যাড়া'রূপী সুখেন দাস , সেই গাছটি আজও রয়েছে। সত্যনারায়ণ খাঁ প্রয়াত হন ১৯৭৬ সালে ,তারপরও মহানায়ক বেশ কয়েকবার এই গ্রামে বিভিন্ন ছবির শুটিং করে গেছেন ।১৯৮০ সালে উত্তমকুমার আকস্মিকভাবে প্রয়াত হন; মুখ থুবড়ে পড়ে টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। ক্রমে সুদিন ফুরোয় চন্ডীমাতা ফিল্মস্-এরও, নয় নয় করে কয়েক বছর চলে তারাও ব্যবসার পাট তুলে দিতে বাধ্য হয়। এর পরও কেটে গেছে বহু বছর,বাংলা ছবির দৈন্যদশা ঘুচলেও উত্তমকুমারের সমতুল্য বিকল্প আজও অধরা।মহানায়কের ৯২ তম জন্মদিনে আজ তেসরা সেপ্টেম্বর বহু টিভি চ্যানেল, সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট, সংবাদপত্রে বহু শ্রদ্ধার্ঘ্য,বহু অনুষ্ঠানের পাশে ব্রাত্য হয়ে থাকবে হাওড়া জেলার এই গ্রাম 'জগৎবল্লভপুর' । যে গ্রামে প্রায় ৩০টি ছবির শুটিং করেছেন মহানায়ক,সেই গ্রামের বাসিন্দারা মনেপ্রানে বিশ্বাস করেন যে গ্রামটি উত্তমকুমারেরই গ্রাম!...আজও যেন সকালবেলায় গেলেই দেখা যাবে সত্যনারায়ণ খাঁ-র বিশাল অট্টালিকার কাছেই মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন উত্তমকুমার ,পরক্ষণেই যেন ফুটবল মাঠে কান পাতলেই শোনা যাবে তাঁর সেই অননুকরণীয় অমোঘ কণ্ঠস্বর, " বগা! গোলে মার...গোলে!!"
উত্তম-স্মৃতিতে আজও সমুজ্জ্বল 'জগৎবল্লভপুর' !!'
![]() |
| ধন্যি মেয়ে ছবির একটি দৃশ্য |
প্রতিবেদন ও ছবি : © স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: মেহবুব হোসেন মল্লিক,আনন্দবাজার পত্রিকা,ও জগৎবল্লভপুরের অধিবাসীবৃন্দ






